1. mti.robin8@gmail.com : Touhidul islam Robin : Touhidul islam Robin
  2. newsnakshibarta24@gmail.com : Mozammel Alam : Mozammel Alam
  3. nakshibartanews24@gmail.com : nakshibarta24 :
মঙ্গলবার, ২৩ জুলাই ২০২৪, ০৫:০১ পূর্বাহ্ন
৮ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ফয়জুন্নেছা ‘রূপজালাল’ ও নওয়াব ফয়জুন্নেছা

  • প্রকাশকালঃ বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০
  • ৩৬৪ জন পড়েছেন

শান্তিরঞ্জন ভৌমিক  :


কুমিল্লার নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর বহুমাত্রিক পরিচয়ের মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো তাঁর সাহিত্য-সাধনা। তিনি জমিদারি পরিচালনা করেছেন, সমাজসেবাতে সমকালে কিংবদন্তি হয়েছেন, শিক্ষা-বিস্তারে বিশেষত নারী শিক্ষার অগ্রদূতের ভূমিকা পালন করেছেন ঐতিহাসিক তৎপর্যে ও আভিজাত্যে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমকালে ‘আইকন’। সাহিত্য সাধনায় ছিলেন নিষ্ঠাবতী সাহিত্যিক। তাঁর রচনার বহর বিশাল। তন্মধ্যে কালজয়ী রচনা ‘রূপজালাল’ শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। একজন নারী কতটা বিদুষী মানসিকতায় উজ্জীবিত হলে শত কর্মে ব্যস্ত থাকার পরও নিভৃতে সাহিত্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে করেছেন সমৃদ্ধ তা সত্যিই বিস্ময়কর।
আমরা যখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ছিলাম নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর কথা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে শুধু নামটিই শুনেছি। ‘রূপজালাল’ নামে তাঁর অমর সৃষ্টির কথা শুনেছি কিন্তু বইটি দেখিনি, পড়িনি। বই তখন দুর্লভ ছিল। মরহুম মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস ল-ন থেকে বইটির ফটোকপি সংগ্রহ করে সম্পাদনা ও মুখবদ্ধ লিখে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ করেন এবং তখন প্রথম বইটি দেখতে পাই, পড়ার সুযোগ হয়। আলাপ-আলোচনায় অনেকেই নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী নাম জানেন, কিন্তু তাঁকে জানেন না, জানতে চান না। এমন কি কুমিল্লার গবেষকগণও উচ্চ কন্ঠে এই মহীয়সীকে নিয়ে কথা বললেও তাঁকে আবিষ্কার করার প্রতি আন্তরিক নন। ‘রূপজালাল’ নাম জানেন, পড়েননি, কেউ কেউ মেকি ভান করে বিশেষজ্ঞ হিসেবে জাহির করেন। তাদের প্রতি আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি শুধু এ ছোট্ট লেখায় ‘রূপজালাল’ এর কাহিনি বা বইটির বিষয়বস্তু কি-তা সাধারণ পাঠককে অবহিত করতে চাই।

‘রূপজালাল’ একটি ব্যতিক্রমধর্মী গ্রন্থ। গ্রন্থটি সার্থক রূপক কাব্য নয়, রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যানও নয়, কিংবা দোভাষী বা মিশ্র ভাষারীতির কাব্যও নয়, আবার আত্মজীবনীমূলক কাব্যোপন্যাসও নয়। তাহলে ‘রূপজালাল’ প্রকৃতপক্ষে কী? আসলে নানা বৈশিষ্ট্যের সমাবেশের ফলে তা এক ব্যতিক্রমধর্মী কাব্যগ্রন্থ।
বিচিত্র বিষয়ের সমাবেশ ঘটলেও ‘রূপজালাল’- এ একটি সুনির্দিষ্ট কাহিনি আছে। কাহিনিটি বর্ণনার কৌশলে ও রচনারীতির আদর্শে প্রাণবন্ত ও শিল্পসম্মত, সংযত, সংহত কবি-মানসের পরিচয় বিধৃত। রূপকথাশ্রয়ী কাব্য-কাহিনি এ গ্রন্থে কবির ব্যক্তিজীবনের দুঃখময় কাহিনি বিবৃত হয়েছে রূপক ব্যঞ্জনার মাধ্যমে। এর ফলে কাহিনিটি যথেষ্ট তাৎপর্যম-িত হয়ে উঠেছে।
‘রূপজালাল’ কাব্যে অসংখ্য চরিত্রের ভিড় লক্ষ্য করা যায়। চরিত্রগুলো এবং কাহিনির ঘটনাবলী সবকিছুই কবি-কল্পিত।
কাব্যের শুরুতে তিনি দিল্লির স¤্রাট সাহাআলামের পরম আত্মীয় কোরেশবংশীয় আমির আগণ খাঁ, তাঁর পুত্র ভুরু খাঁ, পৌত্র মাছিম খাঁ, মাছিম খাঁর পুত্র আবদুল্লা মতাহের, তাঁর পুত্র গোরা গাজী চতুর্ধুরী প্রমুখ ঐতিহাসিক পুরুষ ও বঙ্গদেশের স্বাধীনতার ব্যর্থ প্রয়াস সম্পর্কে ঐতিহাসিক তথ্য উদ্ঘাটন করেছেন। এছাড়াও কবির স্বীয় বংশের বিবরণ, দাদা মুজাফফর গাজী চৌধুরীর এবং পিতার মৃত্যুকালীন সময়ের বর্ণনা, নিজের দুঃখের অর্থাৎ স্বামী-সন্তান-সংসার বিচ্ছেদ-যন্ত্রণা ও কাতরতার বর্ণনা পুরোটাই তাঁর বাস্তব জীবনের ঘটনা অবলম্বনে রচিত। তা সত্ত্বেও কবি রূপকের আশ্রয় নিয়ে চরিত্র ও ঘটনাবলীকে রূপায়িত করেছেন। কাহিনিতে রূপবানু হচ্ছেন কবি নিজেই ফয়জুন্নেছা, হুরবানু তাঁরই সতীন নাজমুন্নেছা, নায়ক জালাল গাজী চৌধুরী তাঁর স্বামী। কাহিনির ঘটনা ধারায় দেখা যায় ফোরতাস নামক এক রাক্ষস জালাল-বাঞ্ছিতা রূপবানুকে অপহরণ করে নিয়ে যায় এবং জালাল বাঞ্ছিতাকে লাভ করার জন্য দুঃসাহসিক অভিযানে বের হয় এবং দৈত্য-দানবের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। জালাল ঘটনাক্রমে ঝম ঝম অধিপতির কন্যা হুরবানুকে বিয়ে করে, কিন্তু রূপবানুকে না পাওয়া পর্যন্ত জালাল কিছুতেই শান্ত হয় না। এ যেন গাজী চৌধুরী তাঁর প্রথম স্ত্রী নাজমুন্নেছাকে ঘরে রেখে জালালের মতো অভিযানে বের হয়েছেন এবং সকলকে বশীভূত করে ফয়জুন্নেছাকে পাবার কাহিনি। অবশেষে ফজুন্নেসাকে পেয়ে গাজী চৌধুরী যেমন শান্ত হয়েছেন, তেমনি রূপবানুকে লাভ করে জালালও শান্ত হয়েছেন। কাব্য-কাহিনির এ প্রাপ্তি ফয়জুন্নেছা ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে মিল আছে। শেষাংশে মিল নেই। শেষাংশে দেখা যায়- হুরবানু আর রূপবানুকে নিয়ে জালাল সোনার সংসার গড়ে তুলেছে। কিন্তু গাজী চৌধুরী নাজমুন্নেছা ও ফয়জুন্নেছাকে নিয়ে তা করতে পারেননি। ফয়জুন্নেছা বিচ্ছেদজীবন দুঃখ ও যন্ত্রণায় ভরে ওঠে। এই দুঃখ ও যন্ত্রণাবোধ নিয়েই কবি এ কাব্য রচনায় অগ্রসর হয়েছেন। চরিত্র ও কাহিনি বিন্যাসে তিনি রূপকের আশ্রয় নিয়েছেন এই জন্য যে, ফয়জুন্নেছা রসপিপাসু মন সাহিত্য সৃষ্টি করতে বসে নিজ জীবন থেকে উপাদান পেয়েছেন। আসলে মুহম্মদ আবদুল হাই-এর ভাষায়- ‘ব্যাধি ও অন্তর্জীবনের অশান্তিই ফয়জুন্নেছা সাহিত্য সাধনার অন্যতম কারণ।’ নিজের জীবনকে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থাপন না করে রূপকের মাধ্যমে ‘রূপজালাল’ রচিত হয়েছে। রূপবানুর ‘রূপ’ আর জালালের ‘জালাল’-এ নিয়েই তো ‘রূপজালাল’। রূপজালালের কাব্যবস্তু ও চরিত্রের যে রূপক মহিমা তা কবির ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে মিল-অমিল উভয় ক্ষেত্রে তাৎপর্যম-িত। ‘রূপজালাল’- এ অজস্র চরিত্র থাকলেও জালাল, রূপবানু ও হুরবানুর চরিত্র রূপায়ণ করাই কবির লক্ষ্য। কবি সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব আরোপ করেছেন জালাল চরিত্রের উপর। জালাল এ কাব্য-কাহিনির নায়ক চরিত্র। তাকে ঘিরে দুটি নারী চরিত্র রূপবানু ও হুরবানু গড়ে উঠেছে। নারী-চরিত্র দুটির মধ্যে রূপবানু প্রধান্য লাভ করেছে। গ্রন্থের নামকরণেও রূপবানু চরিত্রের এ প্রাধান্য স্বীকৃতি পেয়েছে। কাব্যের রূপবানু বাস্তবে কবি নিজেই অর্থাৎ তিনি আর কেউ নন, তিনি ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী। কাব্যটি মধ্যযুগের পুথি সাহিত্য কিংবা রোমান্টিক প্রণয়োপাখ্যান আদলে রচিত। অথচ ‘রূপজালাল’ আধুনিক যুগের সৃষ্টি। এর চরিত্র ও কাহিনি আধুনিকতার ছাঁচে নির্মিত। এই কাব্যটির বৈশিষ্ট্য হলো ফয়জুন্নেছা চরিত্র চিত্রণের ক্ষেত্রে মানুষের জীবন সম্বন্ধে তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতা, মানুষের প্রতি অপরিসীম দরদ ও মমত্ববোধ, সর্বোপরি তিনি ‘দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন’-এ নীতিবাক্যের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থা ও সমর্থন স্থাপন করে কবি তাঁর কাব্যের মানব-মানবীর চরিত্র অংকন করেছেন। কবি ও জমিদার ফয়জুন্নেছা এ কাব্যে অভিন্ন সত্তায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। একথা তো ঠিক-কাব্য-কাহিনির উৎস তাঁরই ব্যক্তিজীবনের মর্মান্তিক ঘটনাবলীতে নিহিত। ব্যক্তি ফয়জুন্নেছাকে জানতে হলে ‘রূপজালাল’ পড়তে হবে। তারপরও যে কথাটি না বললেই নয় তা হলো-ফয়জুন্নেছা ছিলেন উদার-অসাম্প্রদায়িক। হিন্দু-মুসলিম সমাজ-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের সার্থক রূপকার তিনি, কবি নিজে মুসলমান, কাব্যবস্তুও মুসলিম সমাজ-জীবন থেকে নেয়া। কিন্তু প্রকাশরীতিতে কখনও অনাবশ্যক ইসলামী ভাবের আমদানি করেননি; বরং হিন্দু-মুসলমান উভয় ধারার অনুসরণ করেছেন। এছাড়াও তাঁর কাব্যবস্তুতে বৈষ্ণব পদাবলী, হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি, রামায়ণ, মহাভারত, কবি জয়দেব, কালিদাস প্রমুখের কাব্যের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। প্রবাদ-প্রবচন, রূপক, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, চিত্রকল্প নির্মাণেও তিনি হিন্দু ঐতিহ্যের অনুসরণ করেন।
‘রূপজালাল’ কাব্যের শেষাংশে ফয়জুন্নেছা লিখেছেন-
‘হে পাঠকগণ! আমার এই ঘোর দুঃখের কাহিনী শ্রবণে, বোধকরি আপনাদের অন্তঃকরণও আর্দ্র হইবে। যাঁহার চিত্তে এই মনঃপীড়া জন্মিয়াছে, তিনি যে খেদান্বিত হইবেন তাহাতে আর সন্দেহ কি?’
শেষ কথা- ‘রূপজালাল’ ফয়জুন্নেছা মৌলিক সৃষ্টি।

‘বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান’ গ্রন্থে ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর জন্মসাল উল্লেখ্য রয়েছে ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে।
তবে সকলেই মৃত্যু সনটি ১৯০৩ খ্রিস্টাব্দ উল্লেখ করেছেন।

আরেকটি বির্তক হলো ফয়জুন্নেছা চৌধুরীর ছবি প্রসঙ্গে। মূলত তাঁর কোনো ছবি কোথাও নেই। মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস ‘রূপজালাল’ সম্পাদনা করে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশের সময় একটি ধারণাকৃত ছবি বইটিতে সংযোজন করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন-
‘বইয়ে দেয়া হয়েছে নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর একটা কল্পিত ছবি। রূপরেখা দিয়েছেন মরহুম ব্যারিস্টার সৈয়দ হাবিবুল হক। মুরুব্বীদের থেকে শ্রুত তার ভাষণে পরিণত বয়সে এ মহীয়সী মহিলার চেহারা ছিল অনেকটা রাম সুন্দর বসাকের বাল্যশিক্ষায় সংযোজিত মহারাণী ভিক্টোরিয়ার ছবির অনুরূপ। কিন্তু কিছুটা ক্ষীণকায়। এঁকেছেন কুমিল্লা শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের প্রভাষক শিল্পী সুরঞ্জন দত্ত।’
এই ছবিটিই সর্বক্ষেত্রে স্বীকৃত। বাংলাদেশ সরকার ডাক বিভাগ থেকে নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর যে স্মারক ডাক-টিকেট প্রকাশ করেছেন, সেখানেও এই ছবিটিই প্রদর্শিত হয়েছে। সুতরাং এ ছবি ভিন্ন অন্যকোনো ধারণাকৃত ছবি কল্পনা করা অজ্ঞতার পরিচায়ক এবং বিকৃত রুচির ধারক। কারণ, নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর পরিবারের উত্তরপুরুষ সম্মানিত ব্যক্তিবর্গের অনুমোদিত ধারণাকৃত ছবিকেই সম্মান জানানো প্রাজ্ঞতার স্বাক্ষর বলে মনে করি।
এই উপমহাদেশে মুসলিম নারীদের মধ্যে ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীই সর্বাগ্র মহীয়সী নারী হিসেবে ইতিহাসে সমাদৃত হয়ে আছেন। কিন্তু ড. মনিরুজ্জামান রচিত জীবনী গ্রন্থের ‘প্রসঙ্গ কথা’ লিখেছেন ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি, ঢাকা। তিনি লিখেছেন-
‘বঙ্গদেশে নারী-জাগরণ বা মুসলিম মহিলা প্রতিভা সম্বদ্ধে যাঁরা উৎসাহী তাঁরা বেগম রোকেয়ার মতো আরো একটি নামের সঙ্গে পরিচিত, তিনি নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী, নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানও প্রায় সমতুল্য।’
বিনয়ের সাথে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের মন্তব্যকে মেনে নিতে পারছি না। বেগম রোকেয়া জন্মগ্রহণ করেছেন ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে ৯ ডিসেম্বর। তাঁর জন্মের অনেক আগেই উনবিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী জন্ম এবং তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রূপজালাল’ রচিত হয়েছে ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে। বেগম রোকেয়ার জন্মের আগেই ১৮৭৩-এ নারী-শিক্ষা প্রসারের জন্য কুমিল্লায় ফয়জুন্নেছা বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বেগম রোকেয়ার যখন ৯ বছর বয়স তখন ‘বাংলার এক অখ্যাত পল্লীর মুসলমান নারীকে দেয়া হয় ‘নওয়াব’ উপাধি। ভারতে এক নতুন নজীর’।
‘পর্দানশীন ফয়জুন্নেছা নাকি মহারাণী ভিক্টোরিয়ার (১৮১৯-১৯০১) ব্যক্তিগত অনুরোধ ক্রমে একটি ফটোগ্রাফ দিয়েছিলেন। সেটি মহামান্য রাণীর আদেশক্রমে বাকিংহাম প্রাসাদে রক্ষিত হয়েছিল বলে শোনা যায়।’
উল্লেখ্য, ‘শতাব্দী-পূর্বযুগের বাংলাদেশের নিভৃত পল্লীর এক মুসলমান নারীর এই অভাবিত-পূর্ব সম্মান অর্জন সত্যিই বিস্ময়কর’।
নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী ছিলেন এই উপমহাদেশে নারী শিক্ষার অগ্রনায়িকা। মোহাম্মদ আবদুল কুদ্দুস ‘রূপজালাল’ গ্রন্থের ‘জীবন-পরিচিতি’ আলোচনায় উল্লেখ করেছেন-
উল্লেখযোগ্য যে কলিকাতায় বেথুন বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাত্র ২৪ বৎসর পরে লর্ড ডালহৌসীর নারী শিক্ষার স্বপক্ষে ১৮৫০ সালে নির্দেশ দানের মাত্র ২৩ বৎসর পরে, বর্তমান যুগের আলোর দিশারিণী, বেগম রোকেয়ার জন্মের সাত বছর পূর্বে এবং ১৯১১ সালে কলিকাতায় প্রতিষ্ঠিত সাখাওয়াত মেমোরিয়াল প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৯৩১ সালে হাই স্কুলে উন্নত হওয়ার ৫৮ বৎসর পূর্বে নওয়াব ফয়জুন্নেছা কুমিল্লার বুকে পর্দানশীন মেয়েদের জন্য উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে এক দুর্জয় দুঃসাহসিকতার পরিচয় দান করেছেন। এও উল্লেখযোগ্য, যে যুগে মুসলমান ছেলেরাই ইংরেজী স্কুলে পড়ত না, সে যুগে নারী শিক্ষার জন্যে, বিশেষ করে মুসলমান মেয়েদের ইংরেজী শিক্ষার জন্যে তিনি যে আলো জ্বালালেন তা নিঃসন্দেহে দুঃসাহসিকতার কাজ তার দূরদৃষ্টির পরিচায়ক। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তিনিই হলেন মুসলমান নারী শিক্ষার অগ্রনায়িকা, নিশানবর্দার।’
এ ক্ষেত্রে ড. আবু হেনা মোস্তফা কামাল যেখানে উল্লেখ করেছেন- ‘নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর (ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী) অবদানও প্রায় সমতুল্য’ অর্থাৎ বেগম রোকেয়ার সমতুল্য। আমার মনে হয়েছে- এরূপ মূল্যায়ন যথাযথ হয়নি। নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর প্রতি সম্মানও প্রদর্শিত হয়নি। বরং বাক্যটি ‘নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে বেগম রোকেয়ার অবদানও নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর প্রায় সমতুল্য’ হলেই যথাযথ হতো বলে মনে করি।
নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর সেবামূলক কাজের ক্ষেত্র ও অবদান বহুমাত্রিক। তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন যে আধুনিক শিক্ষা ব্যতীত জাতির উন্নতির সম্ভাবনা নেই। সেজন্য তিনি তিন শ্রেণির শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন।
প্রথমত,
পশ্চিমগাঁয়ে নিজ বাড়িতে মসজিদে দীনিয়াত শিক্ষাদান ব্যতীত ধর্মীয় শিক্ষাদানের জন্য স্থাপন করেন একটা অবৈতনিক মাদ্রাসা, পরে ক্রমান্বয়ে তা উপনীত হয়- নিউস্কীম মাদ্রাসায়। আরো পরে উচ্চ মাধ্যমিক ইসলামিক কলেজ। এখন ফয়জুন্নেছা সরকারি ডিগ্রি কলেজ।
দ্বিতীয়ত,
পশ্চিমগাঁয়ে ১৯০১ সালে কন্যা বদরুন্নেসার নামে একটা মধ্য ইংরেজি স্কুল স্থাপন করেন। পরে হাই স্কুলে উন্নীত করা হয়।
তৃতীয়ত,
পশ্চিমগাঁয়ে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। এছাড়া ১১টি কাচারির প্রত্যেকটির নিকটবর্তী নিজ জায়গায় নিজের অর্থে একটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। কুমিল্লা শহরে নানুয়া দিঘির পাড়ে অবস্থিত শৈলরাণী বালিকা হাই স্কুলের প্রাথমিক বিভাগটি স্থাপনে তাঁর সহযোগিতা রয়েছে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ স্থাপনের সময়- নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর আর্থিক সহযোগিতা ছিল। কলেজ-প্রতিষ্ঠাতা আনন্দচন্দ্র রায়-এর পূর্বপুরুষ পশ্চিমগাঁয়ের জমিদারদের বদান্যতায় ও সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। এজন্য ফয়জুন্নেছা ও আনন্দচন্দ্রের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগ ছিল।
চতুর্থত,
১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে কুমিল্লা শহরে সর্বপ্রথম একটি উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন- তার নাম ‘ফয়জুন্নেছা উচ্চ ইংরেজি বালিকা বিদ্যালয়’। এমনকি
‘এই স্কুলের হোস্টেলে থেকে মুসলমান মেয়েদের শিক্ষায় উৎসাহিত করার জন্য তিনি জমিদারীর আয় থেকে তাহাদের জন্য মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থাও করেন।’

পঞ্চমত,
ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী পবিত্র হজ্ব পালন করতে গিয়ে মক্কা শরীফে একটা মুসাফিরখানা ও একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া তথাকার মাদ্রাসা-ই-সওলাতিয়া ও ফুরকানিয়া মাদ্রাসার জন্য মাসিক ৩০০.০০ টাকা সাহায্যের ব্যবস্থা করেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পূর্বে পর্যন্ত তাঁর উত্তরাধিকারীগণ এ সমস্ত অর্থ নিয়মিত পাঠাতেন।
ষষ্ঠত,
জানা যায়- ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরেও একটি স্কুল স্থাপন করেছিলেন। এমন কি স্বর্ণকুমারীদেবীর নারীকল্যাণ প্রতিষ্ঠানেও টাকা দান করেছেন।
জমিদার হিসেবে নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী ছিলেন প্রজারঞ্জক, জনকল্যাণকামী। জমিদারি পরিচালনায় দেওয়ান লকিয়তউল্লাহ ছিলেন তাঁর দক্ষিণ হস্তস্বরূপ, বিশ্বস্ততা ও বিচক্ষণতার প্রতীক। তাঁর সহযোগিতায় নওয়াব ফয়জুন্নেছা পর্দার আড়াল থেকে সকল কাজকর্ম পরিচালনা করতেন। এমনকি প্রজাদের অবস্থা স্বচক্ষে দেখার জন্য মাঝে মাঝে পালকি করে বিভিন্ন মৌজায় যাতায়াত করতেন। ফলে জনহিতকর কাজগুলো করার অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন। গরিব দুঃখীদের জলকষ্ট নিবারণের জন্য পুকুর-দিঘি খনন করে দিয়েছেন, রাস্তাঘাট তৈরি করে দিয়েছেন। এমন কি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিঃ ডগলাস যখন জনহিতকর কাজের একটা প্রকল্প হাতে নেন, সেজন্য ধনী জমিদারদের নিকট অর্থ-কর্জ হিসেবে চান। ফয়জুন্নেছা পরিকল্পনাটি পরীক্ষা করে দেখেন এবং কতটা জনহিতকর তা উপলব্ধি করে মিঃ ডগলাসের নিকট প্রার্থিত টাকার একটা তোড়া পাঠিয়ে দিয়ে বলেন-‘ফয়জুন্নেছা যে টাকা দেয়, তা দান হিসাবেই দেয়, কর্জ হিসাবে নয়।’ ‘যিধঃ ভধরুঁহহবংধ মরাবং, ংযব মরাবং রঃ ধং ধ মরভঃ ধহফ হড়ঃ ধং ধ ষড়ধহ.’
মিঃ ডগলাস এই অপ্রত্যাশিত দান পেয়ে অভিভূত হলেন। শ্রদ্ধায় তাঁর মাথা নত হয়। তিনি ফয়জুন্নেছা সৎকার্যে দান ও অন্যান্য অবদানের কথা ব্রিটিশ স¤্রাজ্ঞী মহারাণী ভিক্টোরিয়াকে অবহিত করেন। রাণী প্রীত হয়ে ‘বেগম’ উপাধিতে ভূষিত করতে উদ্যোগী হন। একথা জানতে পেরে ফয়জুন্নেছা তা প্রত্যাখান করেন। কারণ জমিদারিতে ও পূর্বাঞ্চলে অনেক আগ থেকেই তিনি ‘বেগম’ নামে সর্বজননন্দিত। একথাটি ব্রিটিশ রাজদরবারে গোচরিভূত করা হয় এবং পূর্ব সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীকে ১৮৮৯ খ্রিস্টাব্দে ‘নওয়াব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তৎকালীন ভারতবর্ষে এক অনন্য নতুন নজীর সৃষ্টি করা হয়। এখন পর্যন্ত আর কোনো নারী-ব্যক্তিত্বকে এরূপ উপাধি দেয়া হয়েছে কীনা তা আমার জানা নেই।
নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণীর সেবা ধর্মের অন্যতম কাজ হলো দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন। লাকসাম দাতব্য চিকিৎসালয় তাঁর দানে স্থাপিত।
কুমিল্লা শহরে চর্থায় ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে কেবলমাত্র মেয়েদের চিকিৎসার জন্যে স্থাপন করেন ‘ফয়জুন্নেছা জেনানা হাসপাতাল’। বর্তমানে কুমিল্লা সদর হাসপাতালের সঙ্গে সংযোজিত হয়ে ‘নওয়াব ফয়জুন্নেছা ফিমেল ওয়ার্ড’ নামে মহিলা বিভাগ হিসেবে পরিচিত ও পরিচালিত।
পশ্চিমগাঁয়ে গোমতী নদীর অদূরে বাড়ির প্রাঙ্গণে দশ গম্বুজ শোভিত নান্দনিক মসজিদটি স্থাপন করেন। এতে তাঁর ধর্মপ্রাণতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ মেলে। তাঁর জমিদারি এলাকায় বিভিন্ন স্থানে মসজিদ নির্মাণের দানও অনেক। প্রকাশ্য দানের চেয়ে গোপন দানই ছিল অনেক অ-নে-ক বেশি।
নওয়াব ফয়জুন্নেছা অমর অবদান হলো বসতবাড়িসহ সমস্ত সম্পত্তি ওয়াকফকরণ। ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে এ ওয়াকফনামা সম্পাদিত হয়। দলিলে উল্লেখ আছে-
‘ধর্ম ও পরম কারুণিক পরমেশ্বরের উদ্দেশ্য যে কার্য করা যায় তাহাই স্থায়ী ও মানবজীবনের সার্থকতা এবং পরমাত্মার ফলপ্রদ বটে। ক্ষণভঙ্গুর মানবদেহ কখন যে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় তাহার নিশ্চয়তা নাই। সুতরাং আমার অবশিষ্ট জীবন ঈশ্বর উপাসনায় পর্যবশিত ও আমার সম্পত্তির উপস্বত্ব ধর্ম ও সৎকার্যে ব্যয় হয় ইহাই কায়মনবাক্যে সংকল্প ও কর্তব্য মনে করিয়াছি। এতদার্থে রাহেলিল্লাহে ওয়াকফনামা লিখিয়া দিলাম। … প্রার্থনা যে খোদাতালা আমার ওয়াকফনামায় লিখিত দানটি কবুল ও মঞ্জুরপূর্বক আমাকে যাবজ্জীবনের পাপ দায় হইতে মুক্ত করুন। স্বার্থ কিংবা শৈথল্যবশতঃ যদি কোন মোতাওয়াল্লী অথবা যে কোন ব্যক্তি আমার কৃত ওয়াকফনামার নির্দিষ্ট সৎকার্যের বাধা জন্মাইবেন তিনি তজ্জন্য খোদাতালার নিকট সম্পূর্ণ দায়ী ও দ-নীয় হইবেন।’
নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী একজন বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী। ঊনবিংশ শতকের চতুর্থ দশকে পূর্ববাংলার এক নিভৃত পল্লীতে জন্মগ্রহণ করে শিক্ষায়, সমাজ-কল্যাণে, সেবাব্রতিতায় যে অনন্য উদাহরণ রেখে গেছেন তা চিরদিন ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। অন্যদিকে সাহিত্য সাধনায় ফয়জুন্নেছা চৌধুরাণী যে কৃতিত্ব প্রদর্শন করেছেন তা তাঁকে পার্থিব জীবনে এনে দিয়েছে মহান সম্মান, অন্যদিকে অমরত্ব।
নবীনগরে কৃষি জমি ধ্বংস কারায় ২ জনকে ৩ মাস করে কারাদন্ড!
নবীনগর সংবাদদাতা: জেলা প্রশাসকের (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) নির্দেশনায় গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে নবীনগর উপজেলার কাইতলা ইউনিয়নের পাইন্নর চর (অচিন্তপুর মৌজা) এলাকায় অবৈধভাবে কৃষি জমি নষ্ট করে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করায় মো. জামাল মিয়া এবং মো.আলাউদ্দিন কে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ এর ১৫ ধারায় এক ১ লক্ষ টাকা করে অর্থদন্ড প্রদান করা হয়।
আসামিরা অর্থদন্ড ঘটনা স্থলে প্রদানে ব্যর্থ হওয়ায় প্রত্যেককে তিন মাস করে বিনাশ্রম কারাদন্ড প্রদান করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো.ইকবাল হাসান।
কৃষি জমি রক্ষায় এ অভিযান সার্বিক ভাবে তত্ত্বাবধান করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মাসুম। ড্রেজারের মাধ্যমে বালু/মাটি উত্তোলন আইনতঃ দন্ডনীয়। এ ধরনের কার্যক্রম থেকে সকলকে বিরত থাকতে নির্দেশ প্রদান করেন।

খবরটি সোস্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো খবর

বিজ্ঞাপন

Laksam Online Shop

first online shop in Laksam

© All rights reserved ©nakshibarta24.com
কারিগরি সহায়তায় বিডি আইটি হোম